শেষ ঠিকানা

সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠে চমকে উঠলো পরিতোষ..70টা Missed call!!! খুব চিন্তায় পরে গেলো সে..বাড়ীতে আবার কোনো বিপদ হলো না তো??? রাতে অফিস থেকে ফিরেও কাজের খুব চাপ ছিলো তার ফোন টা সাইলেন্ট রেখে কাজ করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছে তার খেয়াল নেই…ফোন করলো বাড়ীতে.. ইদানীং তার আর বাড়ী যাওয়া হয়ে ওঠেনা কিছুটা কাজের চাপ আর কিছুটা অনিচ্ছা.. এমনকি ফোনেও খুব যে কথা হয় তাও নয়…কিন্তু কই কেউ তো তোলেনা তার ফোন..তার চিন্তাটা আরো একটু বাড়ে… পর পর 9-10 বার ফোন করলো সে তবু কোনো উত্তর পেলনা…সময় তখন সকাল 6টা..অফিসে অনেক কাজ তৈরি হতে হবে অফিসের জন্য..বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লো সে..রোজগার মতো সব কাজ করছে সে তবু মনটা আজ ভালো নেই তার একটানা 2মাস বাড়ীর সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই..তার বাবা মা তার পাঠানো টাকাটাও আজকাল ফেরত পাঠিয়ে দেয় তাকে… … … …
কাজের মধ্যে ডুবে যায় সে সারাদিন তার আর মনেই থাকে না বাড়ীতে ফোন করার কথা..রাতে অফিস থেকে বেরোবার সময় হঠাৎ মনে পড়ে তার সকালের কথা আবার ফোন করে বার বার ফোন করে সে, কই কোনো জবাব দিচ্ছেনা তো কেউ…আজও তার অনেক কাজ বাড়ী ফিরেই বসতে হবে তাকে..তবে আজ আর ফোন টা সাইলেন্ট করেনি সে কিরকম অজানা অস্থিরতা ঘিরে ধরেছে তার মন টাকে…আজও কালকের মতো কাজ করতে করতে সে ঘুমিয়ে পরে..সকালে উঠে সে চমকে ওঠে আজও তার ফোনে 70টা Missed call..কিন্তু তার পরিস্কার মনে আছে কাল রাতে সে তার ফোন সাইলেন্ট করেনি তাও এত বার ফোন বাজলো সে শুনতে পেলো না ফোনটাই বা সাইলেন্ট হলো কি করে.. সে ভাবলো রাতে কোনো ভাবে হাত লেগে কি তবে সাইলেন্ট হয়ে গেছে?? তাই হবে হয়তো সে আজও ফোনের পর ফোন করে গেল উত্তরটা সেই এক রয়ে গেলো…তবুও অফিস তো যেতেই হবে কোনো উপায় নেই তার, কিন্তু আজ সারাদিন মন বসলো না তার কাজে… সারাদিনে অন্তত 40 50বার তো হবেই ফোন করেছে সে… চিন্তা হলো খুব অন্য কারোর নাম্বারও নেই তার কাছে, কয়েক মাস আগে তার আগের ফোনটা চুরি গেছে কি করবে ভেবে পেলো না বাড়িতে যাবে?? কিন্তু এখন বছরের শেষ অনেক দায়িত্ব তার ওপর সে বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো.. এই ভাবে কিছুদিন চললো, রোজ রাতে তার ফোনটা এক রহস্যময় ভাবে সাইলেন্ট 70টা মিস কল!!!!!! সব সময় তার মনে হতো কোনো এক অদৃশ্য ছায়া তাকে ঘিরে রেখেছে আষ্টেপৃষ্ঠে! সে আর থাকতে পারেনা প্রতিদিন এই এক জিনিস কি হচ্ছে তার সাথে এটা??? অফিসের কজে ভুল করে ফেলছে বস এর সাথে রোজ ঝামেলা লাগছে তার… সে মনে মনে ঠিক করে আর না এবার ফিরতেই হবে তাকে রোজ তার বাবা মা ফোন কেন ধরেনা তা জানতেই হবে তাকে…ছুটি নেয় সে….
তার বাড়ি কলকাতা শহর থেকে অনেকটা দূরে..”কাশীহারা” বর্ধমান জেলার একটা ছোট্ট নির্ভেজাল গ্রাম..গ্রাম্য পরিবেশ থেকে উঠে আসা পরিতোষের শহরের সাথে মানাতে একটু অসুবিধা হয়েছিল শুরুতে, কিন্তু আজ সে নিজেকে সাজিয়ে নিয়েছে শহরের ধাঁচে..আজ প্রায় 10বছর পরে গ্রামে পা দিলো সে, এ কয়েক বছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে গ্রাম টার সেই কাঁচা রাস্তা মাটির বাড়ি আর নেই..তবে বাড়ির পাশে বুড়ো শিব তলাটা একই আছে সেখানকার মানুষ নদী পুকুর গাছপালা সব একই আছে..
হঠাৎ সে খেয়াল করলো গ্রামের সবাই তার দিকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে..হয়তো এ কয়েক বছরে তার অনেক পরিবর্তন হয়েছে বলে, শহরের ছাপ লেগেছে তার গায়ে…সে এসব এর তোয়াক্কা না করে এগিয়ে চলল বাড়ির দিকে..
সময় তখন 5টা, নভেম্বর মাস একটু তাড়াতাড়িই সন্ধ্যে হয়ে যায় এখন..মূল ফটকদ্বার থেকে তার বাড়ীটা একটু ভেতরে পুরোনো আমলের দু’মহলা জমিদার বাড়ী আজ দেখাশোনার অভাবে বাড়ীটির একটা দিক ভেঙে পড়েছে.. এতো বছর পরে বাড়ীতে ফিরে আনন্দের পাশাপাশি এক গা ছমছমানি ভাব হচ্ছে তার… চারিদিকটা অন্ধকার, আলোর রেখাটুকুও কোথাও দেখা যাচ্ছে না… এদিকে তার ফোনের চার্জটাও আজ গেছে… হাতড়াতে হাতড়াতে বাড়ির ভেতরে ঠুকলো সে.. কিছুক্ষণ মা বাবা কে ডেকেও সারা পেলো না সে..উপায় না পেয়ে অন্ধকারে ওপরে যাবার সিঁড়ি খুজলো এতো বছর এখানে থেকেছে সে তাই খুব একটা অসুবিধা হলো না তার খুঁজে নিতে..আস্তে আস্তে সে উপরে উঠলো..সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠেই একটা গাড়িবারান্দা আর তার বাঁ হাতে 4টে ঘর.. সে মাকে আবার ডাকলো এবারেও কোনো উত্তর নেই..চারিদিকে কিরকম গা ছমছমানি ভাব হালকা ঠাণ্ডা হাওয়া বয়ে আসছে উত্তর দিক টা দিয়ে.. পিছনের একটা ঘরে আলো জ্বলে উঠলো হঠাৎ করে ভয়ে তার হাত থেকে ব্যাগটা পরে গেলো..সে আস্তে আস্তে সেই ঘরের দিকে এগিয়ে গেলো… দরজা বন্ধ, হালকা ঠেলা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো সশব্দে.. একটা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে তার নাকটা ঝাঁঝিয়ে উঠলো.. অনেকটা কোনো জন্তু মরে পচলে যে গন্ধটা হয় ঠিক সেই রকম… এরপর তার আর কিছু মনে নেই পরের দিন সকালে যখন তার জ্ঞান ফেরে তখন সে এক চায়ের দোকানের বাইরে…স্থানীয় কিছু লোকের কাছে খবর পায় তার মা মারা যাবার পর তার বাবা আত্মহত্যা করে..কিছুদিন পর তারা গন্ধ পেয়ে সেই ঘরের ভেতর থেকে তার বাবার মৃতদেহ উদ্ধার করে…তার সাথে নাকি গ্রামের লোকেরা যোগাযোগ করার অনেক চেষ্টা করেছিল কিন্তু করতে পারেনি তাই তারাই তার বাবার শেষ কাজটা সম্পন্ন করেছিল…কষ্টে দুঃখে ভেঙে পড়ে সে..নিজেকে ক্ষমা করতে পারেনা পরিতোষ… একরাশ কষ্ট নিয়ে ফিরে আসে কলকাতায়.. বাড়ি ফিরে ব্যাগ খুলতেই সে ব্যাগের ভেতরে তার বাবা মা এর একটা ছবি আর একটি চিঠি দেখতে পায় সে… চিঠি টা খুলে সে দেখে……
“স্নেহের বাবু,
আজ তোমার মা আমাকে একা করে দিয়ে পরলোকে চলে গেলো.. এই এতো বড়ো বাড়িতে আমার একা থাকতে কষ্ট হচ্ছে.. এর মধ্যে তোমার সাথে অনেক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি… তোমার নতুন বাসার ঠিকানা তুমি আমাদের দাওনি তাই হয়তো আমার মৃত্যুর পর তুমি এই চিঠি পাবে… ভালো থেকো সুখী হও
ইতি,
তোমার বাবা….”

এখন পরিতোষ এক মেন্টাল হসপিটালে… খুব সম্ভবত তার অফিসের কলিগরা ই তাকে সেখানে পাঠায়………

অনুশ্রী কর

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s